হাত পা বাঁধা জীবন কাটছে ৮ বছরের তায়িবার,তায়িবার বয়স এখন আট বছর। এ বয়সে তার খেলাধুলা করার কথা। ছুটে বেড়ানোর কথা। কিন্তু জন্মের বছর চারেক পর থেকে তার হাত-পা বেঁধে রাখতে হচ্ছে। জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুটিকে বেঁধে রাখার এ চিত্র সহ্য করতে পারছেন না মা-বাবাসহ প্রতিবেশীরা।নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের লেটিরকান্দা এলাকায় তায়িবাদের বাড়ি। সে ওই গ্রামের মাহফুজুর রহমান ও আঁখি আক্তার দম্পতির মেয়ে। জন্মের পর থেকে শিশুটি মানসিক সমস্যায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু দিনমজুর বাবা মাহফুজুর টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। কখনো দুই হাত একসঙ্গে আবার কখনো দুই দিকে বেঁধে রাখতে হচ্ছে মা–বাবাকে। এভাবেই বেড়ে উঠছে সে।

হাত পা বাঁধা জীবন কাটছে ৮ বছরের তায়িবার
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১২ মে তায়িবার জন্ম। কয় মাস পর শিশুর অদ্ভুত আচরণ দেখে পরিবারের লোকজন পূর্বধলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকেরা তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয় বছরখানেক পর আবারও একই অবস্থা দেখা দেওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু হতদরিদ্র পরিবারটির সামর্থ্য না থাকায় তায়িবাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এর পর থেকে দিন দিন শিশুটির অস্বাভাবিক আচরণ বাড়তে থাকে। তাকে ছেড়ে দিলে নিজেই মাথা চাপড়ায় ও হাত কামড়ায়। যেদিকে খুশি চলে যেতে চায়। অন্যকে মারধর করে, রাতে না ঘুমিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করে। এ কারণে শিশুটির দুই হাত বেঁধে রাখা হচ্ছে।গত শুক্রবার লেটিরকান্দা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তায়িবাদের ছোট্ট একটি টিনের ঘর। বারান্দার খুঁটির সঙ্গে তার হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। তায়িবার মা আঁখি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, দুই ভাই এক
বোনের মধ্যে তায়িবা সবার বড়। সে কথা বলতে পারে না। যখন যা মন চায়, তা–ই করে। তাকে বেঁধে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। শক্ত কোনো কিছু সামনে পেলেই নিজের মাথা ঠুকতে থাকে। ঘুমের ওষুধ ছাড়া কোনো সময় সে ঘুমায় না। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় ঘুমের ওষুধ খাওয়ালেও মধ্যরাত থেকে আর ঘুমায় না। পরে আবার বেঁধে রাখতে হয়।কাঁদতে কাঁদতে আঁখি আক্তার বলেন, ‘মেয়েডারে লইয়া অনেক কষ্টে আছি। রাইত–দিন হাত বাইন্ধা রাখতে হয়। মা হইয়া এইটা দেখতে আর বালা লাগে
না। টেহার লাইগ্গা ডাক্তার দেহাইতে পারি না। যদি সরকার আমার মেয়েডার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা কইরা দিত, তাহলে সুস্থ হয়ে যাইত।’প্রতিবেশী রনি ফকির বলেন, পরিবারটি হতদরিদ্র হওয়ায় বিরল রোগে আক্রান্ত মেয়েটির চিকিৎসা করাতে পারছে না। সব সময় হাত-পা বেঁধে রাখতে হচ্ছে। প্রতিবেশী হয়ে এ দৃশ্য দেখে খুবই খারাপ লাগে।তায়িবার বাবা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমি একজন দিনমজুর। নিজেও অসুস্থ। সংসার চলে না। নিজের ঘর না থাকায় বড় ভাইয়ের এই চালাঘরে পরিবার নিয়া
থাকি। অসুস্থ মেয়েডার চিকিৎসা করাইতে পারতাছি না। ডাক্তার কইছিল চিকিৎসা করাইলে সে বালা হইয়া যাইব। কেউ দয়া কইরা যদি সাহায্যের হাত বাড়াইত, তাহলে হয়তো চিকিৎসা করানো যাইত।’এ ব্যাপারে পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ জাহিদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। শিশুটি যাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায়, সে ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:
